আয়রনের অভাব বর্তমান বিশ্বে অন্যতম প্রধান পুষ্টিগত সমস্যা। এটি বিশ্বব্যাপী প্রতিবন্ধিতার অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞরা একমত যে এটি একটি গুরুতর সমস্যা, তবে কখন এটি প্রকট হয়ে ওঠে এবং কীভাবে এর সর্বোত্তম চিকিৎসা করা যায়, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। সম্প্রতি বিবিসি এ নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন করেছে। যেখানে উঠে এসেছে মানবদেহে আয়রন ঘাটতি সম্পর্কে নানা তথ্য।
আয়রন ঘাটতির লক্ষণ ও প্রভাব:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বাসিন্দা মেগান রায়ান প্রথমে তার অতিরিক্ত ক্লান্তিকে স্বাভাবিক মনে করেছিলেন। তিনি একজন কর্মজীবী মা এবং তিন বছরের সন্তানের দেখভাল করতেন। কিন্তু নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে জানতে পারেন, তিনি আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন।

বিশ্বব্যাপী, প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন আয়রনের ঘাটতিতে ভোগেন। বিশেষ করে শিশু ও প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে এই ঘাটতির হার বেশি। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং কম ওজনের শিশুর জন্ম, প্রিম্যাচিউর ডেলিভারি, এমনকি মৃত শিশুর জন্মের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। শিশুদের মধ্যে এটি দীর্ঘমেয়াদে আচরণগত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, সামাজিকতা ও মোটর স্কিল বিকাশেও সমস্যা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়রন ঘাটতি হলে শরীরে রক্তকণিকা তৈরির পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়, যা অক্সিজেন সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
আয়রন ঘাটতির কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী:
নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের কারণে রক্তক্ষয় হওয়ায় আয়রনের ঘাটতি বেশি দেখা যায়। গর্ভাবস্থায় এটি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এছাড়া, নিরামিষভোজী, ক্রীড়াবিদ এবং নিয়মিত রক্তদানকারীদের মধ্যে আয়রন ঘাটতির ঝুঁকি বেশি। কিডনি রোগ ও সিলিয়াক রোগের মতো শারীরিক সমস্যাগুলিও শরীরের আয়রন শোষণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তাদের শারীরিক বৃদ্ধির জন্য প্রচুর আয়রনের প্রয়োজন হয়। আফ্রিকার এক গবেষণায় দেখা গেছে, ছয় থেকে ১২ মাস বয়সী ৭০% শিশু আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতায় ভুগছে।
আয়রন সাপ্লিমেন্ট বিতর্ক:
গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে, আয়রন ঘাটতি হলে কি সবসময় সম্পূরক গ্রহণ করা উচিত? বিশেষ করে, যদি কোনো শারীরিক উপসর্গ না থাকে, তাহলে সম্পূরক গ্রহণ কতটা কার্যকর হবে তা নিশ্চিত নয়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা আয়রন ঘাটতির কারণে ক্লান্ত বোধ করতেন, তাদের জন্য সাপ্লিমেন্ট কার্যকর ছিল। তবে, যারা স্বাভাবিক অনুভব করতেন, তাদের ক্ষেত্রে এটি কোনো পরিবর্তন আনেনি।
শিশুদের ক্ষেত্রে, অনেক বিশেষজ্ঞ আয়রন সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার পরামর্শ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিকস (AAP) সুপারিশ করে, এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং করা শিশুদের চার মাস বয়স থেকে আয়রন ড্রপ দেওয়া উচিত। কারণ, মাতৃদুগ্ধে আয়রনের পরিমাণ কম থাকে।
তবে, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অপ্রয়োজনীয় আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ শিশুদের ওজন বৃদ্ধি এবং বিকাশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চ-আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণকারী শিশুরা কিছু পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
আয়রন ঘাটতি প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য বিজ্ঞানীরা এখনও কার্যকর ও সঠিক উপায় নিয়ে একমত হতে পারেননি। তবে, পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গঠন এবং ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
/এমএমএইচ
Leave a reply