বাঙালির ঐতিহ্যের সঙ্গী লুঙ্গি

|

আহাদুল ইসলাম:

সম্প্রতি নিজের অভিনীত একটি সিনেমার প্রচারণা চালিয়ে বেশ আলোচনায় অভিনেত্রী ‘বুবলী’। কারণ- তিনি সিনেমাটি প্রচারণার জন্য বিশেষ এক পোশাক পড়েছেন। সেটি হচ্ছে ‘লুঙ্গি’। এই অভিনেত্রী তার ফেসবুক পেজে লুঙ্গি পরিহিত ছবি আপলোড করে লিখেছেন, ‘হেই গাইজ, লুঙ্গি পরে ‘জংলি’ সিনেমা দেখতে গেলে কেমন হয়?’

প্রথমেই বলে নেয়া ভালো, লুঙ্গি বাঙালি পুরুষদের পোশাক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকারিভাবে ঘোষিত জাতীয় কোনো পোশাক নেই বাংলাদেশের। তবে, আন অফিসিয়ালি ‘লুঙ্গি’ দেশের জাতীয় পোশাক—এটি নিয়ে মনে হয় না বিতর্ক রয়েছে। আর লুঙ্গি নিয়ে বিতর্ক থাকবেই কেন? মুক্তিযুদ্ধে দেশের অনেক যোদ্ধা লুঙ্গি গামছা নিয়ে অস্ত্র হাতে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। এছাড়াও মাওলানা ভাসানী আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক অবিস্মরনীয় নাম। একজন অসম্ভব জনপ্রিয়ও নেতা হয়েও পরেছেন লুঙ্গি। অবশ্যই, তিনি হয়তো আরামকে প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি।

লুঙ্গি পরা অবস্থায় রান্না নিয়ে ব্যস্ত মাওলানা ভাসানী। ছবি: সংগৃহীত।

লুঙ্গি একটা অপূর্ব জিনিস। বিদেশিদের কাছে এটা অষ্টম আশ্চর্য। বোতাম নেই, দড়ি নেই, বেল্ট নেই, ফিতা নেই, সেফটিপিন নেই, এই আশ্চর্য জিনিস মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে পরাভূত করে বাংলাদেশিদের কোমরে থাকে কী করে! এবং এটা খুলে যায় না কেন? এবং এটা পরে শোয়ার পরে তা সারা রাত যথাস্থানে থাকে কী করে!

এই মহা রহস্যময় পোশাকটির প্রেমে পড়েছিলেন সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা। তিনি লুঙ্গি পরতেন, যাওয়ার সময় এই দেশ থেকে লুঙ্গি নিয়ে গিয়েছিলেন। লুঙ্গি পরে রিকশায় চালকের আসনে বসে তিনি ফটোসেশন করেছিলেন, সেটা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা।

একবার কবি ফরহাদ মজহার লুঙ্গি পরে ঢাকা ক্লাবে ঢুকতে চেয়েছিলেন, তবে তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে তিনি বিপ্লবী কলাম রচনা ও প্রকাশ করেছিলেন। তাতে বাংলার বিপ্লবী সাহিত্য বেশ ঋদ্ধ হয়েছে এবং নতুন মাত্রা লাভ করেছে।

শুধু তাই নয়, বিনোদনমূলক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে বিদেশিদের দেখা যায় লুঙ্গি পরা অবস্থায়। বিষয়টি এমন নয় যে, আমাদের দেশে আর কোন পশ্চিমা পোশাক নেই। তারপরও যে একবার পরেছেন এই লুঙ্গি, সে যেন এই বিশেষ পোশাকের আরামের কাছে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেছেন। বলা যায়, অনেকটা আসক্ত।

‘লুঙ্গি’ এমনই এক পোশাক যেটিকে ঘিরে রয়েছে বলিউড গান। রয়েছে ‘লুঙ্গি ড্যান্স’-ও। ভারতীয় সুপারস্টার রজনিকান্ত, এমনকি শাহরুখ খানও এই পোশাক পরে নেচে গেয়ে কুড়িয়েছেন ব্যাপক প্রশংসা।

এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানের পর, নৌকা থেকে ধরা খেয়েছিলেন নৌকার দুই কাণ্ডারি। সেসময় আনিসুল হক ও সালমান এফ রাহমান পরে ছিলেন গেঞ্জি ও লুঙ্গি।

বাংলা সাহিত্যের অনন্য এক লেখক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তার ‘তৈল’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘তৈল যে কি পদার্থ, তাহা সংস্কৃত কবিরা কতক বুঝিয়াছিলেন। তাহাদের মতে তৈলের অপর নাম স্নেহ। বাস্তবিকও স্নেহ ও তৈল একই পদার্থ। আমি তোমায় স্নেহ করি, তুমি আমায় স্নেহ কর অর্থাৎ আমরা পরস্পরকে তৈল দিয়া থাকি। স্নেহ কি? যাহা স্নিগ্ধ বা ঠান্ডা করে , তাহার নাম স্নেহ । তৈলের ন্যায় ঠাণ্ডা করিতে আর কিসে পারে?’

যদি এই প্রবন্ধে টুইস্ট করে লেখা যায়; তাহলে ‘লুঙ্গি’ সম্পর্কে বলা যেতেই পারে, লুঙ্গি যে কি জিনিস, তাহা বাঙালিরা ছাড়া আর কে বোঝে? বাঙালির কাছে লুঙ্গির অপর নাম সুখ, আরাম কিংবা ভবের দেশে ঘুরার একমাত্র পোশাক। বাস্তবিকও লুঙ্গি ও আরাম একই বিনি সূতার মালায় গাঁথা। আমি লুঙ্গি পরি, তুমি লুঙ্গি পর; মানে আমরা পরস্পর দেশি ভাই। দেশ বিদেশে পিউর বাঙালি চেনার উপায় ‘লুঙ্গি’। লুঙ্গি কি? যাহা স্নিগ্ধ বা ঠান্ডা করে, তাই লুঙ্গির ন্যায় ঠাণ্ডা করিতে আর কিসে পারে?

/এআই


সম্পর্কিত আরও পড়ুন




Leave a reply